স্টিয়ারিং ধরিয়ে দিলেই চালক তৈরি? ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
স্টিয়ারিং ধরিয়ে দিলেই চালক তৈরি? ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
একজন অদক্ষ চালকের হাতে একটি গাড়ি শুধু একটি যানবাহন নয়—তা হয়ে উঠতে পারে চলন্ত মৃত্যুফাঁদ। প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে সড়কে বের হতে হয়। আর সেই যাত্রার নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করে চালকের দক্ষতা, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের ওপর।
কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় একজন চালক তৈরি হন, সেই ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাই যদি যথাযথ নিয়ন্ত্রণ, অভিন্ন মানদণ্ড ও নিয়মিত তদারকির বাইরে থাকে, তাহলে সড়ক নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব—এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাংলাদেশে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ খাতে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনুমোদনহীন বহু প্রশিক্ষণকেন্দ্র কার্যক্রম চালাচ্ছে।
কোথাও প্রশিক্ষকের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, কোথাও প্রশিক্ষণ যানবাহনের মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের পরিবর্তে শুধু গাড়ি চালানোর সুযোগ দেওয়াকেই প্রশিক্ষণের প্রধান পদ্ধতি হিসেবে অনুসরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআরটিএ—দেশে অনুমোদিত মোটর ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুলের তালিকা প্রকাশ করে থাকে।
বিআরটিএর সর্বশেষ প্রকাশিত তালিকাটি ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল হালনাগাদ করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো—অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের বাইরে যারা প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, তাদের কার্যক্রম কতটা নিয়মিত নজরদারির আওতায় রয়েছে? ‘স্টিয়ারিং ধরিয়ে দিলেই চালক তৈরি’ রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে খোঁজ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন একটি চিত্র পাওয়া গেছে—অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিজস্ব উদ্যোগে ড্রাইভিং শেখানোর কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এসব প্রশিক্ষণকেন্দ্রের কোনো কোনোটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সেখানে চালক তৈরির প্রক্রিয়া বলতে মূলত প্রশিক্ষণার্থীকে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরিয়ে দিয়ে রাস্তায় চালানোর সুযোগ দেওয়াকেই বোঝানো হয়। একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সঙ্গে কথা বলার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য ছিল, “স্টিয়ারিং ধরিয়ে দিলে আস্তে আস্তে চালাতে চালাতেই পাকাপোক্ত হয়ে যাবে।
” তবে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন—একজন চালককে দক্ষ করে তুলতে শুধু গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতাই কি যথেষ্ট? একজন পেশাদার চালককে শুধু গাড়ি চালানো জানলেই চলে না। তাকে জানতে হয় ট্রাফিক আইন, সড়ক চিহ্ন ও সংকেত, প্রতিরক্ষামূলক ড্রাইভিং, জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয়, যানবাহনের মৌলিক যান্ত্রিক বিষয়, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং পথচারী ও অন্যান্য সড়ক ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা। অভিন্ন সিলেবাসের অভাব নিয়ে প্রশ্ন ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল সংশ্লিষ্টদের অন্যতম অভিযোগ—
দেশব্যাপী ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের জন্য একটি অভিন্ন ও আধুনিক সিলেবাস কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে। তাদের মতে, একটি স্কুল এক পদ্ধতিতে, অন্য স্কুল আরেক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিলে প্রশিক্ষণের মানে স্বাভাবিকভাবেই পার্থক্য তৈরি হবে। ফলে একজন প্রশিক্ষণার্থী কোন বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভাবে শিখবেন, কত ঘণ্টা তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ নেবেন, কত ঘণ্টা ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ নেবেন এবং প্রশিক্ষণ শেষে তার দক্ষতা কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে—
এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট জাতীয় মানদণ্ড থাকা জরুরি। বিআরটিএর ওয়েবসাইটে ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল ও ইন্সট্রাক্টর লাইসেন্স সংক্রান্ত বিভিন্ন ফরম ও সেবা রয়েছে। একই সঙ্গে অনুমোদিত ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুলের তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলোর প্রতিনিধিদের দাবি, শুধু অনুমোদন দেওয়া নয়, অনুমোদনের পর প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে—সেটি নিয়মিত পরিদর্শন ও মূল্যায়নের আওতায় আনা জরুরি।
অনুমোদিত স্কুলগুলোর ভিন্ন চিত্র অনুসন্ধানে কথা বলা কয়েকটি অনুমোদিত ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুলের প্রতিনিধিরা জানান, তারা ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ইঞ্জিন ও মেকানিক্যাল বিষয়, ট্রাফিক আইন-কানুন, সড়ক নিরাপত্তা ও চালকের দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। তাদের দাবি, সব প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানকে একই মানদণ্ডে আনা গেলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রশিক্ষণের মান আরও বাড়ানো সম্ভব। একজন অনুমোদিত ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুলের প্রতিনিধি বলেন,
“আমরা নিয়ম মেনে প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু একই এলাকায় যদি অনুমোদনহীন কেউ কম খরচে বা কম সময়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলে, তাহলে মানসম্মত প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় সমস্যায় পড়ে।” তাদের দাবি, বিআরটিএ নিয়মিত পরিদর্শন করলে এবং অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিলে প্রশিক্ষণ খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে। লাইসেন্সের আগে প্রশিক্ষণ কি বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত? ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল সংশ্লিষ্টদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি—
ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে অনুমোদিত ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুলের প্রশিক্ষণ সনদকে আরও কার্যকরভাবে বিবেচনা করা। বর্তমানে বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়ায় আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং লিখিত, মৌখিক ও ফিল্ড টেস্টের মতো ধাপ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের যুক্তি, প্রশিক্ষণ স্কুলে নির্ধারিত সময়ের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার প্রমাণ,
প্রশিক্ষণার্থীর উপস্থিতি, তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক মূল্যায়ন এবং প্রশিক্ষকের প্রত্যয়নকে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে চালক তৈরির প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা বাড়বে। তবে এর সঙ্গে লাইসেন্স পরীক্ষার স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনুমোদনহীন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের বিস্তার ড্রাইভিং স্কুল সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনুমোদনহীনভাবে পরিচালিত প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সঠিক সংখ্যা কত—তার কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান এই প্রতিবেদনের হাতে নেই। এ কারণে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশ্ন উঠছে—বিআরটিএর অনুমোদিত তালিকার বাইরে পরিচালিত প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো চিহ্নিত করতে নিয়মিত মাঠপর্যায়ে অভিযান বা পরিদর্শন হচ্ছে কি না? যদি কোনো প্রশিক্ষক নিজেই যথাযথ প্রশিক্ষণ না নিয়ে থাকেন, তার অধীনে নতুন চালক তৈরি হলে সেই চালকের দক্ষতার মান কীভাবে নিশ্চিত হবে—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশিক্ষণ গাড়ির ফিটনেস নিয়েও উদ্বেগ ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত যানবাহনের নিরাপত্তা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোনো কোনো প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রশিক্ষণ যানবাহনের ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
একটি প্রশিক্ষণার্থীকে এমন গাড়িতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে যেটির ব্রেক, স্টিয়ারিং, টায়ার, লাইট বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যান্ত্রিক অংশ যথাযথ অবস্থায় নেই, তাহলে প্রশিক্ষণার্থী নিজেই দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ফলে প্রশিক্ষণ যানবাহনের জন্য আলাদা মানদণ্ড, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা এবং প্রশিক্ষণের উপযোগিতা যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও বেসরকারি স্কুলের অংশগ্রহণ বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালিত হয়েছে।
২০২২ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়ন এবং দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমাতে ৩৫৮ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্টের নথিতেও সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমানোর লক্ষ্য উল্লেখ রয়েছে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্টের আওতায় বিআরটিসির ২৭টি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ৬০ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এখানেই প্রশ্ন তুলছেন বেসরকারি ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুলের প্রতিনিধিরা। তাদের অভিযোগ, সরকারি ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নে পরিচালিত ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রকল্পে বিআরটিএ অনুমোদিত বেসরকারি ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুলগুলোকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
তাদের দাবি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসা অনুমোদিত বেসরকারি স্কুলগুলোর অবকাঠামো ও প্রশিক্ষক দক্ষতাকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ বা অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, প্রকল্পের নথি এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। ‘বিআরটিএ আরও নজর দিলে মান বাড়বে’ ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, তারা বিআরটিএর সঙ্গে বিরোধ চান না; বরং একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করতে চান। তাদের মতে, বিআরটিএ যদি—সারাদেশের জন্য অভিন্ন ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ সিলেবাস প্রণয়ন করে; * প্রশিক্ষকের যোগ্যতা ও সনদের মান নির্ধারণ করে; * প্রশিক্ষণ যানবাহনের আলাদা ফিটনেস মানদণ্ড তৈরি করে; * অনুমোদিত স্কুলে নিয়মিত পরিদর্শন করে; * অনুমোদনহীন প্রশিক্ষণকেন্দ্র বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়; * প্রশিক্ষণার্থীদের ডিজিটাল উপস্থিতি ও প্রশিক্ষণ রেকর্ড সংরক্ষণ করে; * তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার মান নির্ধারণ করে; এবং * প্রশিক্ষণ স্কুলের সার্টিফিকেটের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করে, তাহলে দেশের ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।
‘প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসতে হবে’ ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল সোসাইটির প্রতিনিধিদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে তারা বিআরটিএর চেয়ারম্যান, পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে তাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অনেক সময় তারা পর্যাপ্ত সময় পাননি বলে দাবি করেন।
সোসাইটির নেতারা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিয়মিত সংলাপ থাকলে মাঠপর্যায়ের সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব। তাদের মতে, একটি খাতকে শুধু নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না; সেই খাতের অংশীজনদের সঙ্গে বসে বাস্তব সমস্যা, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনার বিষয়গুলোও জানতে হবে।
ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল সোসাইটির সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী মেহেদী হাসান বলেন, “মানুষ ঘর থেকে বের হলেই কোনো না কোনোভাবে তাকে গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়। সেই গাড়ির চালক যদি অদক্ষ হন, তাহলে তার ঝুঁকি শুধু তার নিজের নয়—যাত্রী, পথচারী এবং অন্য সব সড়ক ব্যবহারকারীর জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।”
তিনি বলেন, “একজন চালককে তৈরি করার প্রতিষ্ঠান যদি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত না হয়, তাহলে আমরা কীভাবে দক্ষ চালক আশা করব? বিআরটিএ অনুমোদন দেওয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ স্কুলগুলোর নিয়মিত তদারকি করলে এবং একটি অভিন্ন জাতীয় সিলেবাস চালু করলে প্রশিক্ষণের মান অনেক বাড়বে।” কাজী মেহেদী হাসানের দাবি, “অনুমোদিত ও অননুমোদিত প্রশিক্ষণকেন্দ্রের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করতে হবে।
প্রশিক্ষকের যোগ্যতা, গাড়ির ফিটনেস, প্রশিক্ষণের সময়কাল, তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ক্লাস—সবকিছুর একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকতে হবে।” তার ভাষায়, “আমরা বিআরটিএর বিরুদ্ধে নই। আমরা চাই বিআরটিএ আরও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করুক। কারণ ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের মানের সঙ্গে সরাসরি মানুষের জীবন ও সড়ক নিরাপত্তা জড়িত।”
বিআরটিএর নজরদারি কতটা কার্যকর? এই প্রতিবেদনের মূল প্রশ্ন এখানেই—দেশে অনুমোদিত ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুলের তালিকা থাকার পরও যদি অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালায়, তাহলে সেগুলো চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? আর যদি অনুমোদিত স্কুলগুলো নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়, তাহলে তাদের প্রশিক্ষণের মান যাচাইয়ের জন্য কী ধরনের পরিদর্শন ব্যবস্থা রয়েছে? বিআরটিএর ওয়েবসাইটে অনুমোদিত মোটর ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুলের তালিকা প্রকাশিত থাকা এবং ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল ও ইন্সট্রাক্টর লাইসেন্স-সংক্রান্ত সেবা থাকার বিষয়টি নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অস্তিত্ব নির্দেশ করে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই কাঠামো কতটা কার্যকর—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
শুধু লাইসেন্স নয়, চালক তৈরির প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নিরাপত্তার আলোচনায় সাধারণত দুর্ঘটনার পর চালকের লাইসেন্স ছিল কি না, গাড়ির কাগজপত্র ঠিক ছিল কি না, চালক বেপরোয়া ছিলেন কি না—এসব প্রশ্ন সামনে আসে। কিন্তু তার আগের ধাপটি অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়—চালকটি কীভাবে প্রশিক্ষিত হয়েছিলেন?
একজন চালককে যদি শুরুতেই সঠিক নিয়ম, নিরাপদ গতি, ব্রেকিং কৌশল, সড়ক চিহ্ন, লেন শৃঙ্খলা, পথচারীর অধিকার, যানবাহনের মৌলিক ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং দুর্ঘটনা এড়ানোর কৌশল শেখানো যায়, তাহলে পরবর্তী সময়ে তার আচরণেও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
বিশ্বব্যাংকের সড়ক নিরাপত্তা উদ্যোগগুলোর লক্ষ্যও শুধু দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়; সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানো এবং মৃত্যু ও গুরুতর আহত কমানোর দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। এখনই সংস্কারের সময় সংশ্লিষ্টদের মতে, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণকে আর শুধু ব্যক্তিগত ব্যবসা হিসেবে দেখলে চলবে না।
এটি সরাসরি জননিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত। তাই অনুমোদিত স্কুলকে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান বন্ধ, প্রশিক্ষকের যোগ্যতা যাচাই, প্রশিক্ষণ যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত, অভিন্ন জাতীয় সিলেবাস প্রণয়ন এবং প্রশিক্ষণ শেষে দক্ষতা যাচাই—সবকিছু একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা দরকার।
নিয়মিত পরিদর্শন, ডিজিটাল তথ্যভান্ডার এবং স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা গেলে কে কোথায় প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, কে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন এবং প্রশিক্ষণের মান কেমন—এসব তথ্যও সহজে যাচাই করা সম্ভব হবে। সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে শুধু চালকের হাতে লাইসেন্স তুলে দেওয়া নয়; কীভাবে সেই চালক তৈরি হলেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল সোসাইটির সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই খাতকে এখনই কঠোর নজরদারি ও আধুনিক নীতিমালার আওতায় না আনা হলে ভবিষ্যতে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বড় আকারে দেখা দিতে পারে। মানুষের জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্নে তাই তাদের দাবি একটাই—‘স্টিয়ারিং ধরিয়ে ছেড়ে দেওয়া নয়, প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বশীল চালক তৈরি করতে হবে।’